ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের লেখনীর মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে মুসলিম লীগের বামপন্থী কিছু কর্মীর উদ্যোগে ঢাকায় ‘গণ-আজাদী লীগ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ‘আশু দাবী কর্মসূচী আদর্শ’ নামে ম্যানিফেস্টোর মাধ্যমে ‘মাতৃভাষায় শিক্ষাদান এবং বাংলা হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ এই দাবি তোলে। একই বছর জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে উর্দু’। এর প্রতিবাদে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে প্রতিবাদ জানান। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়। সংগঠনটি রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে সক্রিয় ছিল এবং একই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা বাংলা - না উর্দু?’ এই নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। পুস্তিকাটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিভাগের অধ্যাপক ও তমদ্দুন মজলিসের প্রধান আবুল কাশেমের লেখা ‘ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাব’ প্রকাশিত হয়।
১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর মতান্তরে ৫ ডিসেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করা হয়। ফলে ৬ ডিসেম্বর ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ মাসের শেষের দিকে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। অধ্যাপক নূরুল হক ভূঞা এর আহবায়ক হন। পূর্ব পাকিস্তানের কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও পরিষদের ভাষা করার দাবি করেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে সর্বদলীয় পরিষদ গঠিত হয়। গণপরিষদের ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলা বাদ দিয়ে উর্দু রাখার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সময় কাজী গোলাম মাহবুব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অলি আহাদসহ প্রমুখ গ্রেপ্তার হন।
একই বছর ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন। ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গায় তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এর আহবায়ক হন আবদুল মতিন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এ বছর ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দীন পল্টন ময়দানের জনসভায় বলেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু।” ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এর আহবায়ক হন কাজী গোলাম মাহবুব। ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব-বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের জন্য নির্ধারিত ছিল। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ দিনটিতে (২১ ফেব্রুয়ারি) সমগ্র দেশে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ আয়োজন করে। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকে শহিদ হন।
ভাষার স্বীকৃতি
ভাষা আন্দোলন ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানের ২১৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দিনটিতে (২৫ সেপ্টেম্বর) ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ হিসেবে পালিত হয়। ২০১৯ সাল থেকে এই দিবস পালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
১৯৯৬ সালে কানাডা প্রবাসী রফিক ও সালাম নামে দু’জন বাংলাদেশি কয়েকজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য মিলে ‘মাতৃভাষা সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব প্রেরণ করেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে। ২০০১ সালের ১৫ মার্চ জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ঢাকার সেগুনবাগিচায়। ২০১০ সালের ৩ নভেম্বর জাতিসংঘের ৬৫তম সাধারণ অধিবেশনে ৪র্থ কমিটিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
ভাষা শহিদ
ভাষা শহিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন ৫ জন। ২০০০ সালে সরকার তাঁদের মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভাষা শহিদরা হলেন-
❖ আবুল বরকত
১৯২৭ সালের ১৬ জুন মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্ম। ডাক নাম আবাই। ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আসেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন এবং এম.এ শেষ পর্বে ভর্তি হন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
❖ রফিকউদ্দিন আহমদ
১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সিংগাইরের পারিল বলধারা গ্রামে জন্ম। ভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে প্রথম শহিদ তিনি। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে অধ্যয়নকালে পড়াশুনা বন্ধ করে ঢাকায় আসেন এবং পিতার মুদ্রণশিল্প ব্যবসায়ে নিয়োজিত হন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
❖ শফিউর রহমান
১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোন্নগর গ্রামে জন্ম। কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে আই.কম পাশ করেন। দেশ বিভাগের পর ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা হাইকোর্টের হিসাবরক্ষণ শাখায় কেরানির চাকরিতে যোগ দেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবপুর রোডে ভাষা আন্দোলনরতদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে তিনি আহত হন এবং সে-দিন সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
❖ আবদুস সালাম
১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার মাতুভূঁইয়া ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামে (বর্তমানে সালাম নগর) জন্ম। দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আর্থিক অনটনে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় তার। কাজের সন্ধানে তিনি চলে যান কলকাতায় বড় বোনের স্বামী আব্দুল কাদেরের কাছে। দেশভাগের পর ফিরে আসেন ঢাকায়। পিয়ন হিসেবে কাজ নেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টর অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে। থাকতেন নীলক্ষেত ব্যারাকের ৩৬/ বি নং কোয়ার্টারে। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হন এবং ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
❖ আবদুল জব্বার
১৯১৯ সালের ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামে জন্ম। পনেরো বছর বয়সে অধিক রোজগারের আশায় বাণিজ্যকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ আসেন। সেখানে জাহাজঘাটে এক ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারই সহায়তায় একটি চাকুরি নিয়ে বার্মায় যান। প্রায় বারো বছর পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ক্যান্সার আক্রান্ত শাশুড়িকে চিকিৎসা করাতে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করান। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। আজিমপুর গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে ভাষাশহিদ হিসেবে অহিউল্লাহ ও আবদুল আউয়ালের নাম-পরিচয় উল্লেখ রয়েছে। তবে একুশের শহিদ হিসেবে তাঁদের স্বীকৃতি মেলেনি। এ কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভাষাশহিদ ৫ জন।