ইতিহাস
বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল বেশ অনগ্রসর। কিন্তু বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ সূচিত হয়। কতিপয় বাঙালি পণ্ডিত বিদ্যানুরাগী এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি নজর দেন। ১৯২৫ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষায় জ্ঞানসাধনা ও সাহিত্যচর্চার প্রস্তাব করেন। ১৯৪০ সালের ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে’ তিনি বাংলা সরকারকে একটি অনুবাদ বিভাগ স্থাপনের অনুরোধ করেন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সর্বপ্রথম ভাষা সংক্রান্ত একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। এ জন্য তাঁকে বলা হয় ‘বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা’। এরপর জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে একাডেমি গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা।
ইতোমধ্যে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম এবং উর্দুর পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার জন্য ঢাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে কয়েকজন তরুণ শাহাদাত বরণ করেন। এ অবস্থায় বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণা ও চর্চার কেন্দ্ররূপে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি অধিকতর বেগবান হয়।
১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বাংলা একাডেমি গঠনে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা ব্যর্থ হয়। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের ১৬ নং দফায় বাংলা ভাষার জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হকের প্রস্তাবে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে বর্ধমান হাউজকে ভাষা গবেষণাগার হিসেবে রূপান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বর্ধমান হাউজ স্থাপিত হয় ১৯০৬ সালে। ১৯৫৫ সালের ২৬ নভেম্বর যুক্তফ্রন্ট সরকার একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আয়োজক সমিতি’ গঠন করে। অবশেষে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ‘বাংলা একাডেমি’ উদ্বোধন করেন।
১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান গণপরিষদে ‘দি বেঙ্গলী একাডেমী অ্যাক্ট’ গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে একাডেমি সরকারি অর্থে পরিচালিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। গবেষণা, অনুবাদ, সংকলন ও প্রকাশনা এবং সংস্কৃতি –এ চারটি বিভাগ নিয়ে একাডেমির যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ ‘দ্য বাংলা একাডেমী অর্ডার, ১৯৭২’ অনুসারে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে একাডেমির সঙ্গে একীভূত করা হয়।
অভিলক্ষ্য
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা, প্রকাশনা ও অনুবাদের মাধ্যমে উচ্চ বৃদ্ধিবৃত্তিক বিদ্বৎ সমাজ এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কতিমনস্ক জাতি গঠন।
পরিচালন কাঠামো
ফ্রেঞ্চ একাডেমির আদর্শে বাংলা একাডেমির কর্মকাঠামো পরিকল্পিত হয়। ৪টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা একাডেমিতে বর্তমানে ৮টি বিভাগ ও ৩টি উপবিভাগ রয়েছে। একাডেমির কার্যনির্বাহী প্রধান হলেন মহাপরিচালক। একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা ও বর্তমান সভাপতি কথাসাহিত্যিক ড.সেলিনা হোসেন।
বাংলা একাডেমির বিভাগ
বাংলা একাডেমি আইন ২০১৩, অনুযায়ী নিম্নোক্ত ৮টি বিভাগ রয়েছে। এগুলো হলো-
➣ গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ।
➣ অনুবাদ, পাঠ্যপ্রস্তক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বিভাগ।
➣ জনসংযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিভাগ।
➣ বিক্রয়, বিপণন ও পুনর্মুদ্রণ বিভাগ।
➣ সংস্কৃতি, পত্রিকা ও মিলনায়তন বিভাগ।
➣ গ্রন্থাগার বিভাগ।
➣ ফোকলোর, জাদুঘর ও মহাফেজখানা বিভাগ।
➣ প্রশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগ।
এছাড়া ৩টি উপবিভাগ হলো-
➣ বাংলা একাডেমি প্রেস।
➣ পরিষদ উপবিভাগ।
➣ হিসাব রক্ষণ ও বাজেট উপবিভাগ।
❖ বাংলা একাডেমি পুরস্কার
১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলা ভাষার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ প্রবর্তন করে। এছাড়াও, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময় কতিপয় বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের নামে পুরস্কার, সম্মাননা ও ফেলোশিপ প্রবর্তন করেছে।
❖ পত্রিকা
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা ৮টি। এগুলো: গবেষণামূলক ত্রৈমাসিক পত্রিকা- বাংলা একাডেমি পত্রিকা, মাসিক সাহিত্য পত্রিকা- উত্তরাধিকার, ত্রৈমাসিক কিশোর পত্রিকা- ধানশালিকের দেশ, ত্রৈমাসিক পত্রিকা- বাংলা একাডেমি বার্তা, ষাণ্মাসিক পত্রিকা- বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান, ষাণ্মাসিক ইংরেজি পত্রিকা- দ্য বাংলা একাডেমি জার্নাল, বাংলা একাডেমি ফোকলোর ও বাংলা একাডেমি অনুবাদ পত্রিকা।
❖ জাদুঘর
ভাষা শহিদদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ‘বাংলা একাডেমি ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’ উদ্বোধন করেন। এটি বর্ধমান হাউসের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। এছাড়াও, ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাডেমির নিচতলায় ‘জাতীয় সাহিত্য ও লেখক’ জাদুঘর উদ্বোধন করেন। বর্ধমান হাউসের তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশে অবস্থিত ‘লোকঐতিহ্য জাদুঘর’। ২০২০ সালে একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী জাদুঘরটি প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করেন।
❖ অমর একুশে গ্রন্থ মেলা
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একাডেমির সীমানার বাইরে চিত্তরঞ্জন সাহা ও অন্যান্যরা বইমেলার আয়োজন করেন। তবে এই বইমেলার নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না। তবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে বইমেলার প্রবর্তন করেন সরদার জয়েনউদদীন। তিনি ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে একাডেমিতে বই মেলার আয়োজন করেন। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মনজুরে মওলা এই বইমেলার নামকরণ করেন ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ১৯৮৪ সালে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ প্রথম সাড়ম্বরে আয়োজন করা হয়।
বাংলা একাডেমির উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ
বাংলা একাডেমি এ যাবত প্রায় ৭৫০০ বই প্রকাশ করেছে। ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ এটি ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১০’ লাভ করে। এর উদ্যোগে জামদানি শাড়ি ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কো ঘোষিত ‘মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’-এর স্বীকৃতি লাভ করে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি
➣ বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন প্রফেসর মযহারুল ইসলাম ও প্রথম নারী মহাপরিচালক ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহীম।
➣ প্রথম পরিচালক ছিলেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক।
➣ প্রথম প্রকাশিত পত্রিকা ‘বাংলা একাডেমি পত্রিকা’।
➣ আহমদ শরীফের সম্পাদিত লায়লী মজনু (১৯৫৭) বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশনা ক্ষেত্রে যাত্রা শুরু করে বাংলা একাডেমি।
➣ বাংলা একাডেমি প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করে ১৯৬২ সালে।