বরগুনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এর উত্তরে ঝালকাঠি জেলা, বরিশাল জেলা, পিরোজপুর জেলা ও পটুয়াখালী জেলা, দক্ষিণে পটুয়াখালী জেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে পটুয়াখালী জেলা, পশ্চিমে পিরোজপুর জেলা ও বাগেরহাট জেলা।
ইতিহাস।
> নামকরণ: জেলাটির নামকরণের সম্পর্কে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের কাঠ ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে কাঠ নিতে এসে খরস্রোতা খাকদোন নদী অতিক্রমে অনূকুল প্রবাহ বা বড় গোনের জন্য অপেক্ষা করত বলে এ স্থানের নাম বড় গোনা। স্রোতের বিপরীতে গুন (দড়ি) টেনে নৌকা অতিক্রম করতে হতো বলে এর নাম বরগুনা। বরগুনা নামক কোনো প্রতাপশালী রাখাইন অধিবাসীর নামানুসারে বরগুনা নাম হয়। বরগুনা নামক কোনো এক বাওয়ালীর নামানুসারে এ স্থানের নাম হয় বরগুনা। বরগুনা মূলত বাকলা চন্দ্রদ্বীপের অংশ। বর্তমান বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ অঞ্চল এক সময় বাকলা চন্দ্রদ্বীপের অংশ ছিল।
জেলা গঠন: ১৮৭১ সালে পটুয়াখালী, মির্জাগঞ্জ, গুলিশাখালী , বাউফল ও গলাচিপা থানার সমন্বয়ে পটুয়াখালী মহকুমা সৃষ্টি হয়। এ সময় বরগুনা গুলিসাখালী থানার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯০৪ সালে বরগুনা থানা সৃষ্টি হয়। ১৯৬৯ সালে বরগুনা মহকুমা সৃষ্টি হয়। ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বরগুনা জেলায় উন্নীত হয়।
বিবিচিনি শাহী মসজিদ: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত পুরাকীর্তিটি মোগল আমলের অন্যতম নিদর্শন। এটি জেলার বেতাগী উপজেলা বিবিচিনি ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৬৫৯ সালে পারস্য থেকে আগত শাহ নেয়ামত উল্লাহ এটি নির্মাণ করেন। তাঁর মেয়ের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করেন।
সিডর স্মৃতিস্তম্ভ: ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের এই জেলা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির সম্মুখীন হয়। নিহতদের স্মরণে জেলা সদরের ১০ নম্বর নলটানা ইউনিয়নের গর্জনবুনিয়া গ্রামে নির্মিত হয় গর্জনবুনিয়া সিডর স্মৃতিস্তম্ভ।
হরিণঘাটা ইকোপার্ক: জেলার পাথরঘাটা উপজেলা অবস্থিত। ২০১০ সালে এটিকে বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করে নাম দেওয়া হয় টেংরাগিরি বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ১৯৬৭ সাল থেকে বনটিতে বৃক্ষ রোপণ শুরু হয়।
টেংরাগিরি ইকোপার্ক (সোনার চর): তালতলী উপজেলার সোনার চর বঙ্গোপসাগরের একটি সমুদ্র সৈকত। এখান থেকে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। এই বনে পূর্ব থেকেই রয়েছে ১২টি কিল্লা ও ৭টি পুকুর। ১৯৬০ সালে এটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৭ সালে নামকরণ হয় টেংরাগিরি বন নামে।
বিহঙ্গ দ্বীপ: পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীর মোহনায় বিহঙ্গ দ্বীপ অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার। দ্বীপ পরিযায়ী পাখিদের বিচরণক্ষেত্র।
লালদিয়া বন ও সমুদ্রসৈকত: এটি পাথরঘাটা উপজেলায় অবস্থিত। এই বনের পূর্বে বিষখালি নদী ও পশ্চিমে বলেশ্বর নদী। উপজেলায়র হরিণঘাটা গ্রামে বিষখালী নদীর তীরে অবস্থিত লালদিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও হরিণবাড়িয়া পর্যটনকেন্দ্র। সেখানকার বিষখালী নদীর অদূরে বঙ্গোপসাগরের পাড়ে লালদিয়া সমুদ্রসৈকতের অবস্থান।
আশার চর: এটি বঙ্গোপসাগরের পশ্চিমে দুই মাইল দীর্ঘ একটি দ্বীপ। আমতলী উপজেলায় পায়রা নদীপথ বরাবর এটি অবস্থিত। এখানে রয়েছে শুঁটকি পল্লি।
শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত: তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকায় অবস্থিত। খড়স্রোতা পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকতের অবস্থান।
রাখাইন পল্লি: জেলার তালতলী উপজেলা ও বরগুনা সদরে রয়েছে রাখাইন পল্লী। এখানে বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায়ের রয়েছে সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প।
মোহনা পর্যটন কেন্দ্র: জেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের পায়রা নদীর তীরে এর অবস্থান। ২০২০ সালে এটি চালু করা হয়।
বরগুনা জিলা স্কুল: ১৯২৭ সালে রহমান আলী আকন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই এটির নাম ছিল বরগুনা এম ই স্কুল। ১৯৭০ সালে স্কুলটি সরকারি করে নামকরণ করা হয় বরগুনা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৯৮৪ সালে জিলা স্কুল নামকরণ করা হয়।
সোনারচর: তালতলী উপজেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এটি শুঁটকির জন্য বিখ্যাত।
হরিণঘাটা সৈকত: এটি লাল কাঁকড়ার জন্য বিখ্যাত।
এছাড়া রয়েছে, হরিণের অভয়ারণ্য বাইনচটকির চর, সোনাকাটা ইকোপার্ক, লালদিয়ার চর, কাউনিয়ার খান বাড়ি, দেবীকুলাম সিংয়ের মন্দির।
অধ্যাপক সৈয়দ ফজলুল হক: বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। জেলার পাথরঘাটা থানায় রায়হানপুর গ্রামে ১৯২০ সালে তাঁর জন্ম।
শাহজাদা আবদুল মালেক খান: জেলার বেতাগী থানার কাউনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে বরিশালে আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাথরঘাটা–বরগুনা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে ছিলেন তৎকালীন সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী।
বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের অধীনে সংঘটিত যুদ্ধে সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টার ছিল বামন উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন। বুকাবুনিয়া ও বামনা উপজেলা থেকেই মূলত মুক্তিযোদ্ধারা এই জেলায় যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ২০১৩ সালে এখানে নির্মাণ করা হয় বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ।
নদ-নদী: পায়রা, বিশখালী, বলেশ্বর, খাকদোন, আন্ধারমানিক, গুলিশাখালী, বুড়িশ্বর, টেপুরা, ধানখালী, গজালিয়া।
অর্থকরী ফসল: ডাল (মুগডাল বেশি চাষ হয়), তরমুজ।