উত্তর-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। কোরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশটি নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তরাংশ নিয়ে উত্তর কোরিয়া। দেশ দুটি একই ইতিহাসের অংশীদার হলেও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পরাশক্তিসমূহের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে বিভক্ত হয়ে যায়। জিডিপি (নমিনাল) ভিত্তিতে বিশ্বের দশম বৃহত্তম অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়া পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব-বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। প্রযুক্তি ও শিল্প জগতে বিশ্বে নেতৃস্থানীয় এই দেশ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক। সিওল হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।
❖ দক্ষিণ কোরিয়ার ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু
দেশটির পশ্চিমে পীত সাগর, পূর্বে জাপান সাগর এবং দক্ষিণে কোরিয়া প্রণালি ও পূর্ব চীন সাগর। পর্বতমালা, উপকূলীয় সমভূমি, নদী অববাহিকা ও উপত্যকায় সমৃদ্ধ দেশটির প্রধান নদী ‘নাকডং’। দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশে রয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতির ৩ হাজার দ্বীপ। এর মধ্যে সর্ববৃহৎ ‘জেজু-ডো’। দেশটির জলবায়ু আর্দ্র মহাদেশীয় ও উপ-ক্রান্তীয়। গ্রীষ্মে প্রবল বৃষ্টিপাত হলেও তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। শীতকালে আবার হিমাঙ্কের ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নামে। উপকূলীয় এলাকাগুলো টাইফুন-প্রবণ।
❖ ইতিহাস
পুরাতন প্রস্তর যুগ থেকে কোরিয়া উপদ্বীপে মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। চীনের রাজবংশগুলোর সঙ্গে কোরীয়দের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সুদূর অতীত থেকে। ৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সাবেকী তিনটি রাজবংশ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর থেকে কোরিয়া ‘সিলা’ রাজবংশের শাসনে চলতে থাকে। ১৯১০ সালে উপদ্বীপটির দখল নেয় জাপান। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নিকট আত্মসমর্পণ করে। ফলে অবিভক্ত কোরিয়া ২ ভাগে ভাগ হয়ে যায় ১৯৪৮ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র কোরীয় উপদ্বীপকে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর ভাগ করে দুটি রাষ্ট্র তৈরি করে। রাষ্ট্র দুটি হলো- দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া রয়ে যায় কমিউনিস্ট ব্লকভুক্ত। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন ব্লকভুক্ত হয়। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যা ‘কোরীয় যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই পক্ষগুলো ‘পানমুনজাম’ নামের একটি গ্রামে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপনীত হয় এবং স্থানটিকে DMZ (Demilitarized Zone) ঘোষণা করা হয়। এর মাধ্যমে কোরীয় যুদ্ধের অবসান হয়।
❖ অর্থনীতি
ষাটের দশকে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল চার অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও হংকংকে একত্রে ‘এশিয়ান টাইগার’ বলা হতো। কোরিয়ার খনিজ সম্পদ মূলত গ্রাফাইট, টাংস্টেন, আকরিক লোহা, কয়লা, স্বর্ণ ও রৌপ্য। যন্ত্রশিল্প ও প্রযুক্তি জগতে দেশটি বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। অটোমোবাইল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, সফটওয়্যার ও রোবোটিকস উৎপাদন এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের পাওয়ার হাউস দক্ষিণ কোরিয়া। স্যামসাং, এলজি, হুন্দাইসহ কোরীয় মালিকানাধীন বহু কোম্পানি বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশটি।
❖ জীবনযাত্রা
রাজধানী সিউল বৃহত্তম শহর যেখানে বাস করেন মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। অন্যান্য প্রধান শহরের মধ্যে রয়েছে বুসান, ইনচেন, ডেগু, ডেজন, গুয়াংজু ও উলসান। জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ জাতিগত কোরীয়। সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ও কনফুসীয় মতবাদের বিপুল প্রভাব রয়েছে। কোরিয়ান খাবার মূলত তৈরি হয় চাল, নুডলস, টফু, সবজি, মাছ ও মাংস দিয়ে। মসলাদার সবজির আইটেম ‘কিমচি’ ও সুপ প্রত্যেক বেলায় খাওয়া হয়। ‘সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ ও ‘কোরিয়া এডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ (KAIST) বিশ্বের খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটি।
➢ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যৌথভাবে ২০০২ সালের (১৭তম) বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক। প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে খেলে।
➢ ১৯৮৮ সালে সিউলে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ২৪তম আসর বসে।
➢ তায়োকোন্দোর জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ায়।
➢ দেশটির বার্ষিক জন্মহার বিশ্বে সর্বনিম্ন।
➢ স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা।
➢ ইন্টারনেটের গতিতে বিশ্বে শীর্ষে।
➢ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে স্থাপিত ঘাঁটিতে ২৮ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে দেশটিতে।
➢ এপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও জি ২০-এর সদস্য।
➢ জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় (২০০৭-২০১৬) মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন দেশটির নাগরিক বান-কি-মুন।
❖ একনজরে
সরকারি নাম: রিপাবলিক অব কোরিয়া।
আয়তন: ৯৯ হাজার ৩৯২ বর্গকিলোমিটার।
রাজধানী: সিউল।
স্বাধীনতা লাভ: ১৫ আগস্ট ১৯৪৮।
জনসংখ্যা: ৫,১৪,১৮,০০০।
মাথাপিছু জিডিপি: ৪৪,৭৪০ ইউএস ডলার।
মুদ্রা: উয়ন।
বৃহত্তম বিমানবন্দর: ইনচেন।
সমুদ্রবন্দর: বুসান, গুনসান, গুয়াংইয়েং, জেজু, পুসান।
প্রেসিডেন্ট: ইউন সুক ইওল (পরিবর্তনশীল)।
সরকার ব্যবস্থা: রাষ্ট্রপতিশাসিত।