বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ জেলা মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। ভূ-প্রকৃতি অনুসারে বরেন্দ্র অঞ্চল (মহানন্দা নদীর পূর্ব দিকের এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বরেন্দ্র ভূ-ভাগ বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এলাকা) ও দিয়াড় অঞ্চলে (মহানন্দা নদী থেকে পশ্চিম দিকের এলাকা দিয়াড় নামে পরিচিত) বিভক্ত জেলাটির শিবগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছে ‘কীর্তিনাশা’ পদ্মা নামে।
❖ভৌগোলিক অবস্থান
রাজশাহী বিভাগের অর্ন্তগত জেলাটির অবস্থান দেশের সর্ব পশ্চিমে। এর পূর্বদিকে রাজশাহী ও নওগাঁ, উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ , পশ্চিমে পদ্মা নদী ও মালদহ এবং দক্ষিণে পদ্মা নদী ও মুর্শিদাবাদ জেলা।
❖নামকরণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পূর্ব নাম ‘নবাবগঞ্জ’। প্রাক-ব্রিটিশ আমলে অঞ্চলটিতে মুর্শিদাবাদের নবাবরা শিকারে আসতেন বলে নাম হয় ‘নবাবগঞ্জ’। অন্য মতে, নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে নামকরণ হয় ‘নবাবগঞ্জ’। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, নবাবি আমলে অঞ্চলটির খ্যাতিমান বাঈজি ‘চম্পারানী’ বা ‘চম্পাবাঈ’-এর নামানুসারে জায়গাটির নাম হয় ‘চাঁপাই’। অথবা রাজা লখিন্দরের রাজধানীর ‘চম্পক’ থেকে ‘চাঁপাই’ নামের উৎপত্তি।
❖জেলা গঠন
১৯৪৮ সালের ১ নভেম্বর রাজশাহী জেলার একটি থানা ও দিনাজপুরের পোরশা থানাসহ একটি নতুন মহকুমার সৃষ্টি হয় এবং নবাবগঞ্জ শহরে স্থাপিত হয় মহকুমা সদর দপ্তর। নতুন মহকুমার নাম রাখা হয় ‘নবাবগঞ্জ’। প্রথম মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ আহমদ চৌধুরী। ১৯৮২ সালে থানাগুলোকে উপজেলা এবং মহকুমাকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মহকুমা থেকে জেলায় রূপান্তরিত হয় নবাবগঞ্জ। জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হন এ. কে. শামছুল হক। ২০০১ সালের ১ আগস্ট সরকারি ভাবে জেলাটির নাম রাখা হয় ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’।
❖নদ-নদী ও জলাভূমি
পদ্মা, মহানন্দা (উপনদী: পুনর্ভরা, নাগর, ট্যাংগন, কুলিখ), পাগলা, পুনর্ভবা। জলাভূমি - বিলভাতিয়া, বিল চুড়ইল, বিল সিংড়া, বিল হোগলা, বিল পুটিমারি, বিল আনইল, বিল মরিচাদহ ও বিল কুমিরাদহ ।
❖ছোট সোনা মসজি: ‘সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’হিসেবেখ্যাত মসজিদটি জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ন অবস্থিত। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক নির্মিত।
বীরশ্রেষ্ঠক্যাপ্টেনমহিউদ্দিনজাহাঙ্গীরেরসমাধি: জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ন অবস্থিত।১৯৭১ সালের১৪ ডিসেম্বর শহিদ হন এবং ১৫ ডিসেম্বর সোনা মসজিদ প্রাঙ্গনে সমাহিত করা হয়।
❖বালিয়াদীঘি: জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়ন অবস্থিত। রাজা বল্লাল সেন (রাজত্বকাল ১১৫৮ - ১১৭৯) দীঘিটি খনন করেন। ‘বল্লাল দীঘি’ কালক্রমে ‘বালিয়াদীঘি’ নামে পরিচিতি পায়।
❖রেশম বীজাগার: জেলার ভোলাহাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম রেশম বীজাগার। ১৯৬১ সালে এটি স্থাপন করা হয় এবং ১৯৮৫ সালে ‘জেলা রেশম সম্প্রসারণ কার্যক্রম’ শুরু হয়।
❖আম ফাউন্ডেশন: জেলার ভোলাহাট উপজেলায় অবস্থিত। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
❖সোনামসজিদ স্থল বন্দর: জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থল বন্দর। এ স্থল বন্দর দিয়ে সারা বছর ফল, কয়লা, পাথর, মসলা ও কৃষি পণ্য প্রভৃতি আমদানি হয়।
❖অন্যান্য স্থান: দারসবাড়ী মসজিদ, চামচিকা মসজিদ, তাহখানা কমপ্লেক্স, কোতোয়ালী দরওয়াজা, কানসাটের জমিদার বাড়ি, ষাঁড়বুরুজ, খঞ্জনদীঘি, কানসাটের জমিদার বাড়ি, তিন গম্বুজ মসজিদ।
❖ গম্ভীরা: জেলার জনপ্রিয় লোকসংগীত। সমাজের নানা অসঙ্গতির সমালোচনা করা এ গানের বৈশিষ্ট্য।
❖ আলকা: এক ধরনের হাস্যরসাত্মক লোকসংগীত। বোনাকানা নামে জনৈক ব্যক্তি এর উদ্ভাবন করেন।
❖ ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আম। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৭ম। দেশে ৭২ জাতের উৎপাদিত আমের মধ্যে জেলাটির ‘খিরসাপাতি আম’ দেশের ‘তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য’ হিসেবে নিবন্ধিত হয় ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এবং সনদ পায় ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি। জেলাটির ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। জেলার অন্যতম উৎপাদিত আম হলো- গোপালভোগ, ল্যাংড়া, মোহনভোগ, সিন্দুরা, সুবর্ণরেখা, কুয়াপাহাড়ি, রাখালভোগ, রাঙাগুড়ি, গোবিন্দভোগ, তোতাপুরী, মিশ্রিকান্ত, জালিবান্ধা প্রভৃতি।
❖ গুড় বাজার: আখ জেলার দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল। এ অঞ্চলে চিনিকল না থাকায় স্থানীয়ভাবে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরী করা হয় এবং স্থানীয় ভাবেই বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
✡ ব্যক্তিত্ব
ইলা মিত্র: (১৮ অক্টোবর ১৯২৫ — ১৩ অক্টোবর ২০০২): একজন বাঙালি মহীয়সী নারী এবং সংগ্রামী কৃষক নেতা। ১৯৪৭ - ৫০ সালে নাচোলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চারবার পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ‘হিরোশিমার মেয়ে’ গ্রন্থ অনুবাদের জন্য ‘সোভিয়েত ল্যা- নেহেরু’ পুরস্কার পান এবং ভারত সরকার ‘তাম্রপাত্র অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেন।
রফিকুন্নবী: র’নবী নামে পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোবরাতলা গ্রামে ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। ‘টোকাই’ চিত্রের স্রষ্টা র’নবী। ১৯৭৮ সাল থেকে টোকাই কার্টুন নিয়মিত প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’। তাঁর ‘টোকাই’ দেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের পক্ষ থেকে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করে আসছে।
গনিতজ্ঞ প্রফেসর আব্দুর রহিম: (১৮৯৫ - ১৯৫৮) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। গণিত বিষয়ক তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
অন্যান্য ব্যক্তিত্ব: নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন আহমদ, ড. মনিরুজ্জামান মিঞা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি), ড. জহুরুল হক, দিয়ানতুল্লাহ চৌধুরী ওরফে লুকা চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মঈন উদ্দিন আহমেদ (মন্টু ডাক্তার)।
✹ একনদৃষ্টিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ
আয়তন: ১৭০২.৫৬ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যা: ১৮,৩৫৫২৭ জন (জনশুমারি ২০২২)।
শিক্ষা হার: ৭১.৯২ শতাংশ (জনশুমারি ২০২২)।
সংসদীয় আসন: ৩টি (৪৩তম আসন - চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ), ৪৪তম আসন - চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর), ৪৫তম আসন - চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর)।
মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর: ৭ নং সেক্টর। কমান্ডার ছিলেন লে. কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান চেীধুরী।
উপজেলা: ৫টি (চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট)।
পৌরসভা: ৪টি (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, রহনপুর ও নাচোল পৌরসভা)।
ইউনিয়ন: ৪৫টি।
গ্রাম: ১,২৯৪টি।
নদী: ৪টি (পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও পাগলা)।
ডাকঘর: ৮৫টি (বড় ১৩টি এবং ছোট ৭২টি)।