❖ চট্টগ্রাম জেলা: সমৃদ্ধ ইতিহাস,ঐতিহ্য আর বৈচিত্রে পরিপূর্ণ বার আউলিয়ার দেশখ্যাত চট্টগ্রাম । এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম ও ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক রাজধানী এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এর ঐতিহাসিক নাম পোর্টো গ্র্যান্ডে এবং ইসলামাবাদ।এটি এশিয়ায় ৭ম এবং বিশ্বের ১০ম দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শহর।
❖ নামকরণ: এই জেলার নামকরণ বৈচিত্রে ভরা এবং এ পর্যন্ত ৪৮টি নাম পাওয়া যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো -সুহ্মদেশ, ক্লীং, রম্যভূমি, চাতগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চক্রশালা, শ্রীচট্টল, চাটিগাঁ, পুস্পপুর, চিতাগঞ্জ, চাটিগ্রাম ইত্যাদি। তবে নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ–
(ক). পণ্ডিত বার্নোলির মতে, আরবি‘শ্যাত (খন্ড)’ অর্থবদ্বীপ, গঙ্গা অর্থ গঙ্গানদী এ থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি।
(খ). অন্য মতে,ত্রয়োদশ শতকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে আসেন বারজন আউলিয়া, তাঁরা একটি বড় বাতি বা চেরাগ জ্বালিয়ে উঁচু জায়গায় স্থাপন করেছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘চাটি’ অর্থ বাতি বা চেরাগ এবং ‘গাঁও’ অর্থ গ্রাম।এ থেকে নাম হয় ‘চাটিগাঁও’।
(গ). এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্সের মতে, এ এলাকার একটি ক্ষুদ্র পাখির নাম থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি।
(ঘ). চট্টগ্রাম ১৬৬৬ সালে মোগল সাম্রাজ্যের অংশ হয়। আরাকানীদের হটিয়ে মোঘলরা নাম রাখে ইসলামা বাদ। ১৭৬০ সালে নবাব মীর কাশিম আলী খান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কে জেলাটি হস্তান্তর করেন। ব্রিটিশরা এর নাম রাখে চিটাগাং।
❖ভৌগলিক অবস্থান: জেলার উত্তরে ফেনী ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কক্সবাজার, পূর্বে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা এবং পশ্চিমে নোয়াখালী জেলা ও বঙ্গোপসাগর। এই জেলার আয়তন ৫,২৮২ দশমিক ৯৮ বর্গ কিলোমিটার।
❖জেলাগঠন: ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা গঠিত হয়। তিন পার্বত্য জেলা চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৬০ সালে পার্বত্য এলাকা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এ জেলা ভেঙ্গে কক্সবাজার জেলা গঠিত হয়। তবে ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভা সংগঠিত হয়। এটিকে বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তর করা হয়েছে।
❖ অর্থনীতি: চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ এই সমুদ্র বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয় । দেশের সর্বমোট রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ,আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৮০ ভাগ,মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ এই জেলার উপর দিয়ে সংঘটিত হয়। যার জিডিপি-তে অবদান ১২ শতাংশ। দেশের প্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল হিসাবে ১৯৮৩ সালে জেলার হালিশহরে নির্মাণ করা হয় ‘চট্টগ্রাম ইপিজেড’। লন্ডন ভিত্তিক FDI ম্যাগাজিন ‘The Financial Times’ এর জরিপে চট্টগ্রাম ইপিজেড বিশ্বের ৭০০ টি ইকোনোমিক জোনের মধ্যে Cost Effective Zone category-তে তৃতীয় স্থান এবং Best Economic Potential 2010-2011 category-তে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে।
বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কর্ণফুলি ইপিজেড’। ইতোমধ্যে সরকার দেশের নবম,জেলার তৃতীয় ইপিজেড হিসাবে রাঙ্গুনিয়া ইপিজেড কে অনুমোদন দিয়েছে। এটিতে আইটি-ভিত্তিক এবং অবকাঠামো উন্নয়ন শিল্প প্রাধান্য পাবে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতাধীন নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করছে। উল্লেখযোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান- জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প (সীতাকুন্ড), ইস্টার্ন রিফাইনারি, কাফকো, সিইউএফএল, টিএইচপি কমপ্লেক্স, পাহাড়তলি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, যমুনা অয়েল, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস, ইউনিলিভার, গ্ল্যাক্সো প্রভৃতি।
জেলায় আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর- ১টি, ভারী শিল্প ৩২৮টি, পাটকল ২৪টি, সরকারি বস্ত্রকল ৫টি, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ১০টি, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি ৬৪৭টি, রাবার বাগান ৮টি, সার কারখানা ৩টি, চা বাগান ২৩টি, চামড়া শিল্প ১৯টি, জাহাজ-ভাঙা শিল্প ৮০টি (প্রায়),জাহাজ নির্মাণ শিল্প ৩০টি, বহুজাতিক কোম্পানি ১২টি।
❖প্রাকৃতিক সম্পদ: জেলার একমাত্র গ্যাস ফিল্ড সাঙ্গু আবিষ্কৃত হয় ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কেয়ার্ণ এনার্জির এই গ্যাস ফিল্ড নিয়ে চুক্তি সম্পাদিত হয়। ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। ১৯৬০ এর দশকে শংখ ও মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকায় তামাক চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি (এখন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি) রাঙ্গুনিয়াতে তামাক চাষের ব্যবস্থা করে এবং পরে লাভজনক হওয়ায় চাষীরা তা অব্যাহত রাখে।সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় লবণ চাষ হয়।শহরের অদূরের হালদা নদীর উৎসমুখ থেকে মদুনাঘাট পর্ষন্ত মিঠা পানির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হিসাবে বেশ উর্বর।রপ্তানির ক্ষেত্রে সামুদ্রিক মাছ হাঙ্গর, স্কেট, রে, হেরিং, শার্কফিন ও চিংড়ি উল্লেখ্য।
❖ প্রধাননদী: কর্ণফুলী,হালদা,মুহুরী ও সাঙ্গু।
❖ দর্শনীয় স্থানসমূহ: ফতেহপুর শিলালিপি, খৈয়াছড়া ঝর্ণা, গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত, চন্দ্রনাথ পাহাড়, চুনতি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য, জাম্বুরী পার্ক, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, পতেঙ্গা, পারকি সমুদ্র সৈকত, ফয়েজ লেক, ভাটিয়ারী, সন্দ্বীপ, সহস্রধারা ঝর্ণা, সুপ্তধারা ঝর্ণা, চট্রগ্রাম ওয়ার সিমেন্ট্রি, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ, ছুটি খাঁ মসজিদ, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার, মহছেন আউলিয়ার দরগাহ, চন্দ্রনাথ মন্দির, মহামনি বৌদ্ধ বিহার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
❖ মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাটে অবস্থিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে মীরসরাই সদরের দক্ষিণে ফেনাফুনি ব্রীজের পাশে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নং জেটিতে নোঙর করা অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াত থেকে পাক সেনাদের অস্ত্র খালাস করতে শ্রমিকরা অস্বীকার করে ও পরে বাধা প্রদান করে।
❖ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন: গণকবর-৯টি, বধ্যভূমি- ১৩টি, স্মৃতিস্তম্ভ- ৯টি।
❖ সাহিত্যে চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয় ষোড়শ শতকে। সে সময়েরউল্লেখযোগ্য কবি ও সাহিত্যিক হলেন- কবি শাহ মোহাম্মদ ছগির, রহিমুন্নিসা, মুহম্মদ মুকিম,সাবিরিদ খান, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, দৌলত উজির বাহরাম খান,মুহম্মদ কবির,সৈয়দ সুলতান,নওয়াজিশ খান।
❖ আরাকান রাজসভার কবি: দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওল, কোরেশী মাগন ঠাকুর, কবি মরদন এবং আব্দুল করিম খোন্দকার।
অষ্টম শতক থেকে পরবর্তীকাল: কবি আবদুল হাকিম, আস্কর আলী পণ্ডিত,নবীনচন্দ্র সেন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আশুতোষ চৌধুরী।
❖ আধুনিক যুগ: মাহাবুব উল আলম,আবুল ফজল,সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ,ডক্টর আবদুল করিম,আহমদ শরীফ,আবদুল হক চৌধুরী,আহমদ ছফা,সুকুমার বড়ুয়া।
❖ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব: মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্যাণী দাস,কল্পনা দত্ত,বিনোদ বিহারী চৌধুরী।
❖ অসহযোগ আন্দোলন: কাজেম আলী, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত।
❖ ভারত ছাড় আন্দোলন: মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।
❖ ভাষা আন্দোলন: আবুল কাসেম, মাহবুব উল আলম চৌধুরী।
❖ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: বীর উত্তম খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাবেলায়েত হোসেন, মোজাহার উল্লাহ।
❖ রাজনীতিবিদ: অলি আহমেদ, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু,আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী,এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী,যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী।
❖ অর্থনীতিবিদ: মুহাম্মদ ইউনূস, হোসেন জিল্লুর রহমান।
❖ বিজ্ঞানী: জামাল নজরুল ইসলাম, মুহাম্মদ ইব্রাহিম, শুভ রায়।
❖ ব্যবসায়ী: আবদুল বারী চৌধুরী, আবুল কাসেম খান, মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি।
❖ ভাস্কর: নভেরা আহমেদ।
❖ শিক্ষাবিদ: আবদুল করিম, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ,কামিনীকুমার ঘোষ, প্রণব কুমার বড়ুয়া,মুহম্মদ এনামুল হক।
❖ সাংবাদিক: মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।
আয়তন: ৫,২৮৩ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যা: ৯,১৬৯,৪৬৪ জন (জনশুমারি ২০২২)।
শিক্ষার হার: ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ (জনশুমারি ২০২২)।
উপজেলা: ১৫টি (মীরসরাই, সীতাকুন্ড, সন্দ্বীপ, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, কর্ণফুলী)।
সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলা: ৫টি (মীরসরাই, সীতাকুন্ড, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ)।
থানা: ২৭টি।
পৌরসভা: ১৫টি (মীরসরাই, বারইয়ারহাট, সীতাকুন্ড, সন্দ্বীপ, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, পটিয়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, বোয়ালখালী, নাজিরহাট, দোহাজারী)।
ইউনিয়ন: ১৯০টি, গ্রাম-১২৬৭টি, সিটি কর্পোরেশন- ১টি (চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ৪১ ওয়ার্ড বিশিষ্ট)।
সংসদীয় আসন: ১৬টি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: ৩টি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: ৬টি।
মেডিকেল কলেজ: ২টি।
মেরিন একাডেমি: ১টি।
মিলিটারী একাডেমি: ১টি।
নেভাল একাডেমি: ১টি।
মেরিন ফিসারীজ একাডেমি: ১টি।