মধুমতির কোল ঘেঁষে গড়ে উঠা অন্যতম জেলা গোপালগঞ্জ। প্রাচীনকালে এ এলাকাটি বঙ্গ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। এই জেলায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাও জেলাটিতে জন্ম গ্রহণ করেন।
❖ ভৌগোলিক অবস্থান: জেলাটির উত্তরে ফরিদপুর জেলা, দক্ষিণে পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলা, পূর্বে মাদারীপুর ও বরিশাল জেলা, পশ্চিমে নড়াইল জেলা।
❖ নামকরণ: ব্রিটিশ আমলে গোপালগঞ্জ জেলা এক সময় রাজগঞ্জ নামেও পরিচিত ছিল। গোপালগঞ্জ অঞ্চলটি মাকিমপুর স্টেটের জমিদার রাণি রাসমনির দায়িত্বে ছিল। তিনি এক জেলে কন্যা ছিলেন। তিনি একদিন এক ইংরেজ সাহেবের প্রাণ রক্ষা করেন। তখন ছিল সিপাই মিউটিনির সময়। পরবর্তীতে তারই পুরস্কার স্বরূপ ইংরেজরা তাকে সম্পূর্ণ মকিমপুর অঞ্চল দিয়ে দেন। রানী রাসমনির নাতি ছিলেন গোপাল। সেই গোপালের নামানুসারে রাজগঞ্জের নাম হয় গোপালগঞ্জ।
❖ ইতিহাস: প্রাচীনকালে এলাকাটি বঙ্গ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। সুলতানী ও মোঘল যুগে এ অঞ্চল হিন্দু রাজারা শাসন করতেন। ১৮৭২ সালে মাদারীপুর মহকুমায় গোপালগঞ্জ নামক একটি থানা গঠিত হয়। ১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে বাকেরগঞ্জ জেলা থেকে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯০৯ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে ভেঙ্গে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়। গোপালগঞ্জ এবং কোটালীপাড়া থানার সঙ্গে ফরিদপুর মহকুমার মুকসুদপুর থানাকে নবগঠিত গোপালগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জেলাটির প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব সুরেশ চন্দ্র সেন। ১৯২১ সালে গোপালগঞ্জ শহরের মানে উন্নীত হয়। ১৯৩৬ সালে মুকসুদপুর থানা বিভক্ত হয়ে কাশিয়ানী থানা গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে গোপালগঞ্জ সদর থানাকে ভেঙ্গে টুঙ্গিপাড়া নামক একটি থানা গঠন করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। গোপালগঞ্জ জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন জনাব এ. এফ. এম. এহিয়া চৌধুরী।
❖ নদ-নদী: মধুমতি, বাঘিয়ার, ঘাঘর, পুরাতন কুমার, বিলরুট ক্যানেল, কালিগঙ্গা, টঙ্গীখাল, দিগনার, বাগদা, কুশিয়ারা, মধুপুর, শৈলদহ, ছন্দা।
❖ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
➣ গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় 'জয়বাংলা পুকুর' ৭১ এর বধ্যভূমি।
➣ ভাটিয়াপাড়া সম্মুখ সমর স্মৃতিসৌধ।
➣ ৭ মার্চ চত্ত্বর।
✡ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
(১৭ মার্চ ১৯২০ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫)
জন্মস্থান - টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ। পিতা: শেখ লুৎফর রহমান। মাতা: শেখ সায়েরা খাতুন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি এবং জাতির জনক।
➣ ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে কারাগারে থেকেই জোর সমর্থন দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
➣ ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী সভায় শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দপ্তরের মন্ত্রী হন।
➣ ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণা করেন এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন।
➣ ১৯৬৭ সালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ নামে এক মামলায় পুনরায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের চাপে ২২ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
➣ ১৯৬৯ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
➣ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ‘জাতির জনক’ উপাধিতে ভূষিত করে।
➣ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্দারন করেন।
➣ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটেরর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং তাঁতে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নেওয়া হয়।
➣ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
➣ ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
➣ ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ সংক্ষেপে 'বাকশাল' নামে সর্বদলভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।
➣ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করেন।
➣ ২৫ বছর মেয়াদী ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন।
➣ ১৯৭৩ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাঁকে ‘জুলি ও কুরি’ পদকে ভূষিত করে।
➣ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার ধানমন্ডিস্থ বাস ভবনে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
✡ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা
(৮ আগস্ট ১৯৩০ - ১৫ আগস্ট ১৯৭৫)
জন্মস্থান- টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ। পিতা: শেখ জহুরুল হক। মাতা: শেখ হোসনে আরা বেগম। তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন সময়ে তিনি মামলা পরিচালনা করা, দলকে সংগঠিত করা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলে তিনিও বঙ্গবন্ধুর সাথে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নামে গোপালগঞ্জ শহরে বেগম ফজিলাতুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
✡ শেখ হাসিনা
(১৯৪৭ - বর্তমান)
জন্মস্থান: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ। পিতা: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাতা: বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা।
১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি বোষ্টন বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেডা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বেলজিয়ামের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের এবার্টি বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস্ বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন ।
❖ শেখ রেহনা: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় কন্যা।
❖ শেখ কামাল: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় পুত্র।
❖ শেখ জামাল: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র।
❖ শেখ রাসেল: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র।
❖ শেখ মোশাররফ হোসেন (খান সাহেব): সমাজসেবার জন্য ‘খান সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে তমগাই কায়েদে আজম খেতাবে ভূষিত হন। ১৯৬৫ সালে এমএলএ নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে গণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
❖ মোল্লা জালালউদ্দিন আহমেদ: গোপালগঞ্জ জেলার বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবক। ১৯২৬ সালে বরফা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ছিলেন। ১৯৪৮ - ৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
❖ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৫ - ১৯৪৭): জন্ম - কলকাতায়। পৈতৃক নিবাস কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রাম। সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী কবি। তাঁর রচিত গ্রন্থ - ছাড়পত্র (১৩৫৪), ঘুম নেই (১৩৫৭), পূর্বাভাস (১৩৫৭), অভিযান (১৩৬০), হরতাল (১৩৬৯), গীতিগুচ্ছ (১৩৭২)।
❖ রমেশ চন্দ্র মজুমদার: জন্ম - মুকসুদপুরের খান্দারপাড় গ্রামে। ১৯১১ সালে ইতিহাসে এমএ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার নিযুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।
❖ এছাড়া রয়েছে, মৌলভী আবদুল হাকিম (১৮৮৭ - ১৯৫৫),খান বাহদুর রোকন উদ্দিন আহমেদ (১৮৮০ - ১৯৩৮) , সাংবাদিক নির্মল সেন (১৯৩০ - ২০১৩), আবদুস সালাম খান (১৯০৬ - ১৯৭২), ফটিক গোঁসাই (১৮৪২ - ১৯৫৭) ।
১. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স।
২. ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি।
৩. কবি সুকান্তের পৈত্রিক ভিটা।
৪. ‘জয় বাংলা পুকুর’ ৭১ এর বধ্যভূমি।
৫. বর্ণি বাওড়।
৬. টুঙ্গিপাড়াস্থ বাগানবাড়ি (পাখির অভয়ারণ্য)।
৭. বর্ষাপাড়ার লাল শাপলার বিল।
৮. বলাকইড় পদ্মবিল।
৯. শেখ রাসেল শিশু পার্ক।
১০. উজানী ও বনগ্রাম জমিদার বাড়ি।
ক্ষুদ্র- নৃগোষ্ঠী: রাজবংশী, বর্মণ।
❂ একদৃষ্টিতে গোপালগঞ্জ
আয়তন: ১৪৮৯.৯২ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যা: ১২,৯৫,০৫৩ জন (জনশুমারি ২০২২)।
শিক্ষার হার: ৭৯.৮০ শতাংশ (জনশুমারি ২০২২)।
উপজেলা: ৫টি (গোপালগঞ্জ সদর, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া)।
থানা: ৫টি।
পৌরসভা: ৪টি (গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া, মুকসুদপুর)।
ইউনিয়ন: ৬৮টি।
সংসদীয় আসন: ৩টি।
এলাকার বিচারে উপকূলীয় ১৯টি জেলার মধ্যে ১৩তম। দেশের মধ্যে ৪৪তম। ঢাকা বিভাগের ১৭টি জেলার মধ্যে ৮ম স্থানে রয়েছে।