❂❂❂ কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর, মৎস্য বন্দর এবং পর্যটন কেন্দ্র। এই জেলায় রয়েছে প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।
❖ অবস্থান: জেলার উত্তরে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বান্দরবান, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য ও নাফ নদী এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর দ্বারা বেষ্টিত।
❖ ইতিহাসে কক্সবাজার: এই জেলার ইতিহাস মুঘল আমলে শুরু হয়। বর্তমান কক্সবাজারের পাশ দিয়ে মুঘল শাসন কর্তা প্রিন্স শাহ সুজা আরাকান প্রদেশে যাওয়ার পথে এ অঞ্চলের পাহাড় ও সাগরের মিলিত সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হন। তাঁর সেনা বহরে থাকা এক হাজার পালকি (ঢুলি) সেখানে অবস্থান নেয়। ফলে এক হাজার ঢুলির (পালকি) নামে এর নামকরণ করা হয় ডুলাহাজারা। যা বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন। মুঘল আমলের পরবর্তীতে এ অঞ্চল ত্রিপুরা এবং আরাকানদের দখলে চলে যায়। তারপর পর্তুগীজরা কিছু সময় এ অঞ্চলে শাসন করে। এরপর শাসনভার চলে যায় ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।
❖ নামকরণ: জেলাটির প্রাচীন নাম ছিল পালংকী। একসময় এটি প্যানোয়া নামে পরিচিত ছিল। প্যানোয়া শব্দটির অর্থ ‘হলুদ ফুল’। এটি চট্টগ্রাম থেকে ১৫৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ব্রিটিশ নৌ-অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স (মৃত্যু-১৭৯৮) কে এ অঞ্চলের দায়িত্বভার দেওয়া হয়। তিনি সেখানে তাঁর নামানুসারে ১৭৯৯ সালে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। যা ‘কক্স সাহেবের বাজার’ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং পরবর্তীতে এটি ‘কক্সবাজার’ নামে পরিচিত পায়। কক্সবাজার থানা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে এবং পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে।
❖ নদ-নদী: মাতামুহুরী, বকখালী, রেজু খাল, নাফ, বাঁক গুজারা খাল, ভোলার খাল, কোহালিয়া, বড় জাং ছড়ি, ছোট জাং ছড়ি, দৌ ছড়ি, গর্জ্জ, মহেশখালী চ্যানেল এবং কুতুবদিয়া চ্যানেল।
❖ প্রধান দ্বীপ: মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহ্পরীর দ্বীপ, ছেঁড়া দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন।
❖ সেন্টমার্টিন: বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা (০৬নং সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন) থেকে ৯ কিমি দক্ষিণে একটি ছোট দ্বীপ (আয়তন ১৭ বর্গ কিলোমিটার)। মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিম উপকূল থেকে ৮ কিমি পশ্চিমে নাফ নদীর মুখে এটি অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি ‘নারিকেল জিনজিরা’ নামে পরিচিত। দ্বীপটির দক্ষিণাংশ ছেঁড়াদ্বীপ নামে পরিচিত।
❖ কুতুবদিয়া: দ্বীপটির আয়তন ১০০ বর্গ কি:মি। উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে কুতুবদিয়া চ্যানেল, বাঁশখালী, পেকুয়া এবং মহেশখালী উপজেলা। এটি উপজেলার স্বীকৃতি পায় ১৯৮৩ সালে। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে দ্বীপটি জেগে ওঠে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে দ্বীপটিতে মানুষের পদচারণা শুরু হয়। ‘হযরত কুতুবুদ্দীন’ নামে এক কামেল ব্যক্তি মগ ও পর্তুগীজ বিতাড়িত করে এ-দ্বীপে আস্তানা স্থাপন করেন। বিভিন্ন সময়ে ভাগ্যাণ্বেষণে ও নির্যাতিত হয়ে আসা মুসলমানেরা কুতুবুদ্দীনের প্রতি শ্রদ্ধান্তরে দ্বীপটির নামকরণ করেন ‘কুতুবুদ্দীনের দিয়া’। পরবর্তীতে এটি ‘কুতুবদিয়া’ নামে স্বীকৃতি পায়। দ্বীপটিকে স্থানীয়ভাবে ‘দিয়া’ বা ‘ডিয়া’ বলা হয়। দ্বীপটিতে ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়।
❖ মহেশখালী: ১৯৮৫ সালে মহেশখালী উপজেলা পরিষদ গঠিত হয়। আয়তন- ৩৮৮.৫০ বর্গ কিমি। দ্বীপটিতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর অবস্থিত। এছাড়া রয়েছে ১২০০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
❖ প্রাকৃতিক সম্পদ: ১৯৬০ সালে কক্সবাজারে খনিজ সম্পদের প্রথম সন্ধান পাওয়া যায়। সমুদ্র সৈকতের বালিতে জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও রুটাইল রয়েছে। যার প্রাক্কলিত মজুতের পরিমাণ ৪৪ লাখ (৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন) টন। প্রকৃত সমৃদ্ধ খনিজের পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন (এক দশমিক ৭৫ মিলিয়ন)।
পুরাকীর্তি: রামকোট তীর্থধাম, কানা রাজার সুড়ংগ, মাথিনের কূপ, ‘মা’ অষ্টভূজা ও ছেংখাইব ক্যাং।
❖ দর্শনীয় স্থান: অজ্ঞমেধা ক্যং, আদিনাথ মন্দির (মহেশখালী), কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, কুতুবদিয়া বাতিঘর, সাবরাং পার্ক, ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক, রাডার স্টেশন, রাবার বাগান (রামু), রামকোট বৌদ্ধ বিহার, ইনানী বিচ, সুগন্ধা বীচ, হিমছড়ি ও লামারপাড়া বৌদ্ধবিহার।
❖ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত: বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে রয়েছে ঝিনুক মার্কেট, বার্মিজ মার্কেটসহ পাঁচ তারকা হোটেল।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ: দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও আইকনিক রেল স্টেশন, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প-২, খুরুশকুল আশ্রয়ন প্রকল্প, জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর সাবমেরিন ঘাঁটি, দেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন।
❖ কক্সবাজার-দোহাজারী রেলপথ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের উদ্বোধন করেন। একই বছরের ১ ডিসেম্বর এই পথে বাণিজ্যিক রেল চলাচল শুরু হয়। একইসঙ্গে কক্সবাজারের ঝিলংজায় ঝিনুকের আদলে নির্মিত দেশের প্রথম ও এশিয়ার সর্ববৃহৎ দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশনও উদ্বোধন করা হয়। ২৯ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের এই স্টেশনের স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। রেলপথে নির্মিত স্টেশন ৯টি। প্রকল্পটির নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালে।
❖ প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব : মরহুম ওস্তাদ আবু বক্কর, সমরজিত রায়, নুরুল হক বীরপ্রতীক, কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।
রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির: বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির কুতুপালং।
একনজরে কক্সবাজার জেলা
>> আয়তন: ২,৪৯১.৮৬ বর্গ কিলোমিটার।
>> জনসংখ্যা: ২৮,২৩,২৬৫ (জনশুমারি-২০২২)।
>> শিক্ষার হার: ৭১.৪৫ শতাংশ।
>> উপজেলা: ৮টি। থানা: ৮টি।
>> সংসদীয় আসন: ৪টি।
>> মেডিকেল কলেজ: ১টি।
>> বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: ১টি।
>> সেনানিবাস: রামু সেনানিবাস। ১০ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর।
>> স্থল বন্দর: টেকনাফ
>> নৃগোষ্ঠী: চাকমা, মারমা।