ঢাকার কয়েক শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে এখনো যে কয়টি স্থাপনা টিকে আছে আহসান মঞ্জিল তার অন্যতম। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কুমারটুলি এলাকায় অবস্থিত গোলাপী প্রাসাদ খ্যাত আহসান মঞ্জিল ছিল ঢাকার নওয়াবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত প্রাসাদটি বাংলার প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে এটি একটি জাদুঘর।
ইতিহাস
মোগল আমলে জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ এনায়েত উল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রংমহল নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র মতিউল্লাহ’র নিকট থেকে রংমহলটি ফরাসিরা ক্রয় করে একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। ঢাকার নওয়াব পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩০ সালে ফরাসিদের নিকট থেকে কুঠিবাড়িটি কিনে সংস্কার করে বাসভবনে পরিণত করেন। তাঁর ছেলে আবদুল গনি আধুনিক নকশায় সেখানে নতুন একটি ভবন করে ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে নাম রাখেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ১৮৫৯ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৭২ সালে। নবনির্মিত প্রাসাদ ভবনটি তখন রংমহল এবং আগের ভবনটি অন্দরমহল নামে পরিচিত পায়। প্রসঙ্গত, ঢাকা শহরের প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলেছিল আহসান মঞ্জিলে (১৯০১ সালে)।
প্রাসাদ সংস্কার
১৮৮৮ সালে ৭ এপ্রিল প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে অন্দরমহলটি একেবারে ভেঙে পড়ে। পরে সংস্কারের সময় বর্তমানে যে সুদৃশ্য গম্বুজ রয়েছে সেটি সংযোজন করা হয়। পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের জন্য রাণীগঞ্জ থেকে উন্নতমানের ইট আনা হয়। মেরামতকর্ম পরিচালনা করেন প্রকৌশলী গোবিন্দ চন্দ্র রায়। ১৮৯৭ সালে ১২ জুন ঢাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানলে আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দক্ষিণের বারান্দাসহ ইসলামপুর রোড সংলগ্ন নহবত খানাটি সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে। পরবর্তীকালে নবাব আহসানউল্লাহ তা পুনর্নির্মাণ করেন।
রাজনীতি
উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে পাকিস্তানের প্রথম পর্ব পর্যন্ত প্রায় একশ বছর ধরে প্রসাদটি থেকেই পূর্ব বাংলার মুসলমানদের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। পঞ্চায়েত প্রধান হিসেবে ঢাকার নওয়াবগণ প্রায় প্রতিদিন প্রসাদটিতে সালিশি দরবার বসাতেন। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী নওয়াব আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এখানে কংগ্রেস বিরোধী বহু সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সালে ঢাকায় জলকলের ভিত্তি স্থাপনের জন্য বড়লাট নর্থব্রুক ঢাকায় এসে সান্ধ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রাসাদটিতে। ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় এসে আতিথ্য গ্রহণ এ প্রসাদে। বঙ্গবিভাগ পরিকল্পনার প্রতি জনসমর্থন আদায়ের ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি এ প্রাসাদে অবস্থান করেন। এছাড়া খাজা সলিমুল্লাহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সূতিকাগার হিসেবে প্রাসাদটি ইতিহাসের অঙ্গ।
জাদুঘর
জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় ১৯৫২ সালে ঢাকা নওয়াব এস্টেট অধিগ্রহণ করা হলে নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ প্রাসাদটি ছেড়ে পরীবাগে চলে যান। ফলে প্রাসাদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর অযত্নে এটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। নওয়াব পরিবারের উত্তরসূরিদের প্রাসাদটি নিলামে বিক্রির প্রস্তাব ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর প্রাসাদটির স্থাপত্য সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রহমান নাকচ করে দেন। ১৯৮৫ সালে প্রাসাদ ও তৎসংলগ্ন চত্বর সরকার অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে জাদুঘর তৈরির কাজ শুরু করে সরকার। এবং ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
স্থাপত্যশৈলী
প্রাসাদের ছাদের একটি গম্বুজ রয়েছে। মূল ভবনের বাইরে ত্রি-তোরণবিশিষ্ট প্রবেশদ্বার রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে দু’টি মনোরম খিলান। অভ্যন্তরে দু’টি অংশ, পূর্ব অংশে বৈঠকখানা ও পাঠাগার এবং পশ্চিম অংশে রয়েছে নাচঘর ও অন্যান্য আবাসিক কক্ষ। নিচতলার দরবারগৃহ ও ভোজন কক্ষ অবস্থিত।